Sunday , April 5 2026
সর্বশেষ

জিহাদ কত প্রকার ও কি কি

১ম পর্ব দেখে নিন

২। শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করা

প্রথমে আমাদের জানতে হবে শয়তান কে? তারপর তার সাথে জিহাদ করতে হবে।

শয়তান অর্থ বিতাড়িত, বিদূরিত, বঞ্চিত ইত্যাদি। শয়তান হক থেকে বিদূরিত এবং কল্যান থেকে বঞ্চিত বলে তাকে শতয়তান বলা হয়।

‘শয়তান’ হচ্ছে একটি বৈশিষ্ট্যগত নাম। তার নাম ছিল ইবলিস, তাকে ইবলিস ও বলা হয়। ইবলিসকে তার জ্ঞান এবং যোগ্যতার জন্য ফেরেশতা উপাধি দেয়া হয় আর তার নতুন নাম দেয়া হয় আজাজিল (“আল্লাহ্‌ শক্তিদানকারী”)

শয়তান সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনের সুরা : ইয়াসিন, আয়াত – ৬০ এ বলেছেনঃ

اَلَمۡ اَعۡهَدۡ اِلَیۡکُمۡ یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ اَنۡ لَّا تَعۡبُدُوا الشَّیۡطٰنَ ۚ اِنَّهٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ

“হে বনী আদম! আমি কি তোমাদেরকে নির্দেশ দেইনি যে, তোমরা শয়তানের ইবাদাত করো না(১), কারণ সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?”

এছাড়াও পবিত্র কুরআনে সুরা বাকারা আয়াত ২০৮ তে আল্লাহ বলেছেন

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا ادۡخُلُوۡا فِی السِّلۡمِ کَآفَّۃً ۪ وَ لَا تَتَّبِعُوۡا خُطُوٰتِ الشَّیۡطٰنِ ؕ اِنَّهٗ لَکُمۡ عَدُوٌّ مُّبِیۡنٌ

“হে মুমিনগণ! তোমরা পুর্ণাঙ্গভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শক্ৰ”।

কুরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে নিষেধ করেছেন। কুরআন-সুন্নাহর বর্ণনায় পদাঙ্ক অনুসরণের একাধিক ব্যাখ্যা এসেছে-
আল্লামা ইবনে কাসির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন- শয়তানের ‘পদাঙ্ক অনুসরণ’ দ্বারা উদ্দেশ্য তার পথ, কর্মপদ্ধতি আর সে যে কাজের নির্দেশ দেয়; সে অনুযায়ী কাজ করা।
হজরত কাতাদাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, প্রতিটি পাপের কাজই শয়তানের পদাঙ্কের অন্তর্ভুক্ত ‘ (তাফসিরে ইবনে কাসির)

শয়তানের সাথে জিহাদ করার জন্য তাকে চিনতে হবে সে আসলে কি? জ্বীন নাকি ফেরেস্তা। খ্রিষ্টানদের মধ্যে এমন ধারণা আছে যে, ইবলিস আসলে একজন সম্মানিত ফেরেশতা ছিল, তারপর তাকে বের করে দেওয়া হয় এবং সে শয়তান হয়ে যায়। অনেক মুসলিমও এই ধারণা রাখেন, যখন তারা এই আয়াতটি পড়েন—[সূরা বাকারাহ :৩৪]

وَ اِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ

যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, আদমের প্রতি সিজদা করো’, তখন তারা সিজদা করেছিল, তবে ইবলিস ছাড়া। 

ইবলিস জেনেটিকালি জিন হলেও সে ফেরেশতার সম্মান প্রাপ্ত ছিল। এরপর আদমকে সিজদার আদেশ অমান্য করার পর তার নাম হয় ইবলিস বা অভিশপ্ত। তারমানে এখানে ফেরেশতা হিসেবে সম্বোধন করলেও কোন সমস্যা থাকে না। তাছাড়া আরবি ভাষা এই ধরনের বাক্য গঠন করতে দেয়— “সেদিন সন্ধায় দাওয়াতে আমার সব আত্মীয়রাই এসেছিল, নাজিমউদ্দিন ছাড়া।” এখানে নাজিমউদ্দিন আমার আত্মীয় ছিল না, সে ছিল বাবুর্চি।

আরবি ব্যাকরণে তাগ্লীব নামে একটা ব্যাপার আছে। এর মানে, যদি অধিকাংশ কে সম্বোধন করা হয়, তবে কমাংশও এতে সাড়া দেবে। যেমন, এক ক্লাসে ১০০ জনের মধ্যে ৯৯ জন ছেলে, একজন মেয়ে। যদি বলা হয় আরবিতে, ছেলেরা দাঁড়াও, তবে, সেই মেয়েও উঠে দাঁড়াবে। এটাই তাগ্লীব। মেয়েকে আলাদাভাবে সম্বোধনের দরকার নেই।

একইভাবে কুরআনে আল্লাহ্‌ যখন ফেরেশতাদের ডাকলেন, তখন আলাদাভাবে জিন ইবলিসকে ডাকার দরকার নেই।

ইবলিস ফেরেশতা ছিল না- এর আরও একটা প্রমাণ হল সে যদি ফেরেশতা হত, তাহলে আল্লাহ্‌র নির্দেশ অমান্য করতো না। কারণ কুরআনেই ফেরেশতাদের প্রাথমিক গুণ সম্পর্কে বলা হয়েছে- 

সূরা আততাহরীম ৬৬:

لَّا یَعۡصُوۡنَ اللّٰهَ مَاۤ اَمَرَهُمۡ وَ یَفۡعَلُوۡنَ مَا یُؤۡمَرُوۡنَ

তারা আল্লাহ্ আদেশ অমান্য করে না, এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে। 

 ইবলিস যদি ফেরেস্তা হতো তাহলে সে আল্লাহর আদেশ অমান্য করতোনা। কারন আল্লাহর আদেশ অমান্য করা ফেরেস্তাদের বৈশিষ্ট নয়। এতে সহজে বুঝা যায় ইবলিস জিন ।

ইবলিস যে জিন ছিল এব্যাপারে কুরআনে পরিষ্কার আয়াত রয়েছে-[সূরা আলকাহফ ১৮:৫০]

وَ اِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ کَانَ مِنَ الۡجِنِّ

“‘আমি যখন ফেরেশতাদেরকে বললাম, আদমের প্রতি সিজদা করো’, তারা সবাই করেছিল, ইবলিস ছাড়াসে ছিল জিনদের একজন। 

 এই কুরআনের আয়াতের পরেওকি আমরা আমাদের পূর্বের ধারনা সঠিক বলে মনে করবো যে ইবলিশ একজন ফেরেস্তা? না তাহলে আমরা জানতে পারলাম যে ইবলিশ একজন জিন।

মানুষ কিংবা জিন জাতির মধ্যে আল্লাহর অবাধ্য ও বিদ্রোহীগোষ্ঠীর নাম এটি। অভিযোগকারী নাস্তিক মুক্তমনারা। ইবলিস ও তার বংশধর জিন শয়তানদের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছে যারা মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দিয়ে খারাপ কাজে উদ্বুদ্ধ করে। তাদের প্রশ্ন, স্রষ্টা বলে যদি কেউ থেকেই থাকেন, তাহলে তিনি কেন এমন কিছুকে সৃষ্টি করবেন যারা তাঁর নিজ সৃষ্টিকে পথভ্রষ্ট করে জাহান্নামী করবে?

তাদের প্রশ্নের উত্তরে বলা যেতে পারেঃ

প্রথমতঃ কেউই ‘শয়তান’ হয়ে জন্মে না

সবাই নিজ কর্মের দ্বারা সে ‘শয়তান’ হয়। ইবলিস এবং তার উত্তরসূরীদেরকে আল্লাহ জোর করে ‘শয়তান’ বানাননি বরং তারা নিজ কর্ম দ্বারা শয়তান হয়েছে। জিন এবং মানুষের ইচ্ছাশক্তি আছে। তারা ভালো-মন্দ কর্ম বেছে নিতে পারে। ইবলিস ও তার উত্তরসূরীরা নিজেরাই ‘শয়তান’ হওয়া ও মানুষকে কুমন্ত্রণা দেবার পথ বেছে নিয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ ইচ্ছা শক্তির কারনে।

আল্লাহ মানুষ ও জিনকে ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। তাদের দ্বারা ভালো ও খারাপ কর্ম আল্লাহ সম্পাদন হতে দেন। তাদের ভালো কর্মের উপর আল্লাহর সন্তুষ্টি আছে। যেহেতু মানুষের সকল কর্ম আল্লাহর সৃষ্টি কাজেই ভালো কর্মের সাথে সাথে পাপও আল্লাহর ‘ইচ্ছা’ক্রমে হয়। তবে তা কেবলমাত্র এ অর্থে যে আল্লাহ এগুলোকে (পাপ/খারাপ কর্ম) নির্ধারিত করেছেন; এ অর্থে নয় যে আল্লাহ এগুলো অনুমোদন করেন বা আদেশ দেন। পৃথিবীতে যত খারাপ কাজ বা অপরাধ সংঘটিত হয়, এগুলোর উপর আল্লাহ তা’আলার কোনো সন্তুষ্টি নেই। আল্লাহ এগুলো ঘৃণা করেন, অপছন্দ করেন এবং এগুলো থেকে বিরত হবার আদেশ দেন। 

তৃতীয়তঃ হিকমত রয়েছে। 

আল্লাহ কেন শয়তানকে সৃষ্টি করলেন ও খারাপ পথে যেতে দিলেন? ইমাম ইবনুল কাইয়িম জাওযিয়্যাহ (র.) তাঁর ‘শিফাউল ‘আলিল’ গ্রন্থে শয়তান সৃষ্টির পেছনে আল্লাহ তা’আলার বেশ কিছু হিকমতের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ইবলিস ও তার বাহিনীর সৃষ্টির পেছনে এত হিকমত রয়েছে যার বিস্তারিত আল্লাহ ছাড়া কেউই অনুধাবন করতে পারবে না। এর মধ্যে অল্প কিছু হিকমতের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে,

১। ঈমানকে পাকাপোক্ত করা।

শয়তান ও তার শিষ্যদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আমাদেরকে ইবাদতের উৎকর্ষের দিকে ধাবিত করে। নবীগণ এবং আল্লাহর বান্দারা শয়তান ও তার শিষ্যদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই ইবাদতকে চূড়ান্ত উৎকর্ষের দিকে নিয়ে গেছেন। আল্লাহর নিকট শয়তানের হাত থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং শয়তান থেকে বাঁচার জন্য বার বার আল্লাহর নিকট ফিরে আসার মাধ্যমেই তাঁরা তাঁদের ঈমানকে পাকাপোক্ত করেছেন। শয়তান না থাকলে তো ইবাদতের এই সুউচ্চ অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হত না।

২। প্রভুর নিকট ফিরে আসা

মানুষ ও (শয়তান) জিন উভয়েরই আদি পিতাকে ভুল [বড় বা ছোট গুনাহ] দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছে। যারা আল্লাহর বিধানের বাইরে যায়, তাঁর ইবাদতে অহঙ্কার ও অবাধ্যতা করে, তাদের জন্য আল্লাহ একজন আদি পিতা [শয়তান জিনদের] ইবলিসকে একটি নিদর্শন বানিয়েছেন। আর যারা পাপ করলে অনুশোচনা করে আর তাঁর প্রভুর নিকট ফিরে যায়, তাঁদের জন্য আল্লাহ অন্য আদি পিতাকে [আদম (আ.)] একটি নিদর্শন বানিয়েছেন।

৩। পরীক্ষাস্বরূপ

শয়তান আল্লাহর বান্দাদের জন্য একটি পরীক্ষাস্বরূপ। 

শয়তান মানুষকে ওয়াসওয়াসা বা কুমন্ত্রণা দেয় যা মানুষের বিপথগামী হবার জন্য ভূমিকা রাখে। কিন্তু  আল্লাহর বান্দাদের উপর শয়তানের এমন কোন ক্ষমতা নেই যে সে বান্দাদের খারাপ কাজ করতে বাধ্য করতে পারে। সে শুধু মানুষকে কুমন্ত্রণাই দিতে পারে। যারা শয়তানের কুমন্ত্রণার অনুসরণ করে, শয়তানের পথে চলে, তারা পথভ্রষ্ট হয়। এ টুকু ক্ষমতাই কেবল শয়তানের আছে।

মানুষের মতো ইবলিসও হাশরের ময়দানে উঠবে। ইবলিস তখন নিজেকে পরিচ্ছন্ন ও পাপমুক্ত রাখার চেষ্টা করবে।

পবিত্র কুরআনের সুরা ইবরাহিম আয়াত-২২ এ বলেছেন

“আর যখন বিচারের কাজ সম্পন্ন হবে তখন শয়তান বলবে, আল্লাহ তো তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সত্য প্রতিশ্রুতি আমিও তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছি। আমার তো তোমাদের উপর কোন আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে ডাকছিলাম তাতে তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। কাজেই তোমরা আমাকে তিরস্কার করো না, তোমরা নিজেদেরই তিরস্কার কর”

মানুষের সঙ্গে শয়তান যেভাবে প্রতারণা করে
মানুষের সঙ্গে নানাভাবে প্রতারণা করে শয়তান। ফলে সে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে। কুরআনুল কারিমের শয়তানের সেসব প্রতারণার কৌশলগুলো ওঠে এসেছে। তাহলো এমন-
১. মিথ্যা আশ্বাস

یَعِدُهُمۡ وَ یُمَنِّیۡهِمۡ ؕ وَ مَا یَعِدُهُمُ الشَّیۡطٰنُ اِلَّا غُرُوۡرًا 

‘সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদেরকে আশ্বাস দেয়। শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা সব প্রতারণা বৈ কিছুই নয়।’ (সুরা নিসা : আয়াত ১২০)

শয়তান মানুষকে এমনভাবে আশ্বস্ত করে যে, তার জীবন অনেক দীর্ঘ এবং তার কাছে সৎকর্ম ও তওবা করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তাই সে যখন নামাজ পড়ার ইচ্ছা পোষণ করে শয়তান তাকে বলে, তুমি তো এখনও সেই ছোট রয়ে গেছ, যখন বড় হবে নামাজ পড়বে। এবং যখন আত্মশুদ্ধিকারী ব্যক্তি আত্মশুদ্ধি করতে চায় শয়তান তাকে বলে এটাতো তোমার প্রথম মওসুম : আগামী বৎসরের জন্যে তুমি অপেক্ষা কর। আর যখন কোন মানুষ কোরআন পড়তে চায় শয়তান তাকে বলে তুমি সন্ধ্যায় পড়বে। এবং সন্ধ্যা হলে বলে তুমি আগামীকাল পড়বে। এবং আগামীকাল বলে তুমি পরশু পড়বে, এভাবে মৃত্যু পর্যন্ত অপরাধকারী তার পাপের ওপর অবশিষ্ট থাকবে। আর এই প্রক্রিয়ায় শয়তান কিছু কাফেরকে ইসলাম থেকে নিবৃত্ত করে রাখে।

২. মন্দ কাজকে আকর্ষণীয় করে

মানুষের মধ্যে দুটি সত্বা অছে। মনুষত্ব ও পশুত্ব। মানুষের চিন্তা শক্তি আছে। মানুষের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আছে। মানুষের ভালো-মন্দ বাছবিচার করার ক্ষমতা আছে। সে ভালো কাজ করবে না মন্দ কাজ করবে সে সিদ্ধান্ত নেয়ার শক্তি তার আছে।

মন্দ কাজ বেশী আকর্ষণীয় মনে হয়। মূলত শয়তান খারাপ কাজকে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করে এবং খারাপ কাজে প্রলুব্ধ করে। অথচ আল্লাহ মানুষকে ভালো কাজ করতে বলেছেন আর খারাপ বা মন্দ কাজ বর্জন করতে বলেছেন। অপরদিকে শয়তান স্রষ্টার কাছে চ্যালেঞ্জ করেছে যে সে মানুষকে না শোকর করবে, খারাপ বা মন্দ কাজে ব্যস্ত রাখবে।

প্রকৃত অর্থে কে শয়তানের অনুসারী আর কে স্রষ্টার অনুসারী তা পরীক্ষা করার জন্য মূলত এ প্রক্রিয়া।

পবিত্র কোরআনে সূরা কাহাফের ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন –

اِنَّا جَعَلۡنَا مَا عَلَی الۡاَرۡضِ زِیۡنَۃً لَّهَا لِنَبۡلُوَهُمۡ اَیُّهُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا

“পৃথিবীর উপর যা কিছু আছে, আমি সেগুলিকে তার আকর্ষনীয় করেছি মানুষকে এই পরীক্ষা করবার জন্য যে, তাদের মধ্যে কর্মে কে উত্তম”। তাছাড়া আমাদের জীবন দৃষ্টিতে ভুল রয়েছে। আমরা মনে করি খাও দাও ফুর্তি করো দফা হয়ে যায়। এটাই হচ্ছে জীবন। অর্থাৎ জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারণা না থাকার ফলে আমরা ভালো কাজের চেয়ে মন্দ কাজে বেশী আকৃষ্ট হই ও মন্দ কাজে লিপ্ত হই।

অথচ সূরা মূলক ২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা বলেন –

الَّذِیۡ خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَ الۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا

“যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য—কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম?”

খারাপ বা মন্দ কাজ জীবনকে চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ করে আর সৎ কাজ আমাদেরকে চুড়ান্তভাবে সফল করে।

৩. ভয় সৃষ্টির মাধ্যমে

আল্লাহর দুশমন ইবলিশ এর অন্যতম কৌশল হচ্ছে, সে মুমিন বান্দাদেরকে তার বন্ধুদের দ্বারা ভয় দেখায়। তারা যেন ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ না করে। আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানকে ভয় পেতে নিষেধ করেছেন। যখন মুমিনদের ঈমান দুর্বল হবে তখন তাদের অন্তরে শয়তানের ভয় বেশি কাজ করবে। 

আল্লাহ তায়ালা সুরা আল ইমরান এর ১৭৫ নং আয়াতে বলেছেন

اِنَّمَا ذٰلِکُمُ الشَّیۡطٰنُ یُخَوِّفُ اَوۡلِیَآءَهٗ ۪ فَلَا تَخَافُوۡهُمۡ وَ خَافُوۡنِ اِنۡ کُنۡتُمۡ مُّؤۡمِنِیۡنَ

“সে তো শয়তান। সে তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়; কাজেই যদি তোমরা মুমিন হও তবে তাদেরকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর”।

অন্যান্য ভয়ের মধ্যে শয়তান তোমাদেরকে অভাবের ভয়ও দেখায় এই ব্যাপারে আল্লাহ তায়াল বলেছে সুরা আল-বাক্বারাহ আয়াত -২৬৮

اَلشَّیۡطٰنُ یَعِدُکُمُ الۡفَقۡرَ وَ یَاۡمُرُکُمۡ بِالۡفَحۡشَآءِ

“শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং অশ্লীলতার নির্দেশ দেয়”।

আমরা যখন যাকাত দেওয়ার সময় হিসেব করে দেখি কত যাকাত দিতে হবে, তখন ভাবি, “এত্ত গুলো টাকা দিয়ে দিতে হবে! এত টাকা যাকাত দিয়ে কী হবে? মানুষের অভাবের তো কোনো

শেষ নেই। যত দিবো, তত চাইবে।” — যাকাতের পরিমাণ দেখে আমাদের আফসোস শুরু হয়ে যায়, অথচ ভেবে দেখি না যে, এটা হচ্ছে আমাদের সম্পত্তির মাত্র ২.৫%অংশ, খুবই নগণ্য পরিমাণ। বাকি বিশাল ৯৭.৫% অংশ সম্পত্তি আমাদের জমা হয়ে আছে। যাকাত দেওয়ার সময় আমাদের শুধু আফসোস হয় যে, কতগুলো টাকা বের হয়ে গেলো। সেই টাকা না দিলে কত কিছু কিনতে পারতাম, কত কিছু করতে পারতাম। অথচ চিন্তা করে দেখি না যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এত সম্পত্তি দিয়েছেন যে, তার এক নগণ্য অংশও আমাদের কাছে এত বেশি মনে হচ্ছে —এই ধরনের চিন্তাগুলো আসে শয়তানের কাছ থেকে, এইভাবে শয়তান বিভিন্ন ভয় মানুষের মনে সৃষ্টি করে, আল্লাহর কাছ থেকে মানুষকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করার সকল চেষ্টা করে থাকে। 

৪. নেশা সৃষ্টির মাধ্যমে

মাদকদ্রব্য মানুষের দৈহিক, মানসিক বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গে মাদক গ্রহীতা নেশার টাকা সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা সৃষ্টি করে। ইসলাম কল্যাণ ও উপকারের ধর্ম। এ জন্য ইসলাম মাদক ও নেশাদ্রব্য গ্রহণকে হারাম করেছে। আল্লাহপাক পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, সুরা মায়েদা : আয়াত ৯০

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَ الۡمَیۡسِرُ وَ الۡاَنۡصَابُ وَ الۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡهُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ

‘হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কার্য ছাড়া আর কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।’

আমাদের আধুনিক সমাজের অন্যতম ব্যর্থতা হলো, গোড়া বাদ দিয়ে ডালপালা নিয়ে আমরা চিন্তা করি। সমস্যার উৎস থেকে মুখ ফিরিয়ে নালা নিয়ে পড়ে থাকি। মাদকের নেশা যে হারে আজ তরুণদের গ্রাস করছে, এর পেছনের মূল কারণগুলো কি? কোনো সন্দেহ নেই, জীবনের লক্ষ্য ও মূল্য সম্পর্কে অজ্ঞতা এর মূল কারণ। অসৎ সঙ্গ, বেকারত্ব, পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণেও মাদকের নেশাময় জগতে পা দিচ্ছে অনেক বন্ধু।

আসুন, আমরা নিজেদের পরিবারের ভেতর মায়া ও ভালোবাসার বন্ধন গড়ে তুলি, সন্তান কিংবা ছোট ভাইয়ের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখে তাকে জীবনের মূল্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করি, পাড়া মহল্লার অসৎ বন্ধুদের সঙ্গ এড়িয়ে চলি, জীবনের যেটুকু অবসর সময় হাতে আসুক বসে না থেকে দেশ ও সমাজের জন্য কল্যাণকর কাজে ব্যস্ত থাকি, আপনি তখন অনুভব করবেন জীবন সত্যিই আনন্দময়।

এই নেশার মাধ্যমে শয়তান আমাদেরকে প্রতারনা করে আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়।

৫. লোভ দেখানোর মাধ্যমে

লোভ একটি নৈতিক ত্রুটি। লোভ-লালসা মানুষের অধঃপতনের মূল কারণ। লোভ-লালসা হলো অর্থসম্পদ, প্রাচুর্য বা ক্ষমতার প্রতি এক ধরনের দুর্বিনীত ক্ষুধা বা আকর্ষণ যা মানুষকে আত্মতৃপ্তি থেকে বঞ্চিত করে। লোভী মানুষ সারাজীবনের জন্য সন্তুষ্টি থেকে বঞ্চিত থাকে।

লোভী ব্যক্তির মনে অন্যের অর্থসম্পদ বা সম্মান অর্জিত হওয়া দেখলে অনুরূপ অর্থসম্পদ বা সম্মান অর্জনের জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন এবং এগুলো অর্জনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতে কুণ্ঠিত হন না। এতে অন্যের লোকসান বা ক্ষয়ক্ষতি বিষয়টি তার মনে কোনোরকম রেখাপাত করে না। লোভ-লালসায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি প্রায়ই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকে। নিজের ভালো-মন্দ, নিজের লাভ বা প্রাপ্তি নিয়েই সারাক্ষণ নিয়োজিত থাকে। তাদের মুখে আমি, আমার ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগের আধিক্য দেখা যায়। অন্যের লাভ-ক্ষতি বা কষ্ট নিয়ে খুব কমই মাথা ঘামায়। অন্যের সম্মান ইত্যাদির প্রতি কোনো ভ্রক্ষেপ করে না। অন্যের অনুভূতি এদের হৃদয়কে খুব অল্পই স্পর্শ করতে পারে। নিজের প্রাপ্তিতে যদিও বা তাৎক্ষণিক আনন্দ পায় কিন্তু এই সন্তুষ্টি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। এরা বেশ কৌশলী হয়ে থাকে। অন্যের কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে অন্যের কাজের স্বীকৃতি সহজেই নিজের বলে চালিয়ে নিতে পারদর্শী। এ ব্যাপারে লজ্জা-শরমের বালাই একটু কম। তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে বা অর্জন করতে এরা যতটুকু তৎপর থাকে পরিণাম নিয়ে ততটুকুই উদাসীন থাকে। নিজের প্রাপ্তিটুকু হাসিল হলেই খুশি। প্রয়োজনে নীতি-নৈতিকতা জলাঞ্জলি দিতে কুণ্ঠিত হয় না।

বিভিন্ন কারণে লোভ-লালসা মানুষের মনে বাসা বাঁধে। তার মধ্যে ক্রটিপূর্ণ সন্তান লালন একটি। সন্তান লালন-পালনের সময় যদি বাবা-মা সন্তানের কাছে নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপন না করেন বা উপস্থাপনে অস্পষ্টতা বা অসংলগ্নতা থাকে; সন্তান যদি দীর্ঘমেয়াদে

শিশুমনে রেখাপাত এমন অবজ্ঞা, বঞ্চনা বা অপ্রাপ্তির শিকার হয়ে থাকে; অথবা বাবা-মা তাদের মনে লোভ-লালসার মতো বিষয়টিকে লালন করেন অথবা নিজ নিজ কাজের মাধ্যমে লোভ-লালসার বিষয়টি এমনভাবে প্রতিফলিত করেন যাতে সন্তান খুব সহজেই এটিকে স্বাভাবিক গুণাবলি বিবেচনা করে আত্মস্থ করে ফেলে। শৈশবে রোপিত এই বীজ যৌবনে মহীরুহ হয়ে দেখা দেয়। বিভিন্ন ধরনের লোভ-লালসা মানুষের মনে সক্রিয় থাকে। তার মধ্যে ধন-সম্পদ, সামাজিক প্রতিপত্তি এবং সমীহ আদায় করে নেওয়ার তাগিদ অন্যতম। মানুষকে যত প্রকার নেশা বা আশক্তিতে অভ্যস্ত হতে দেখা যায় তার মধ্যে সম্পদ ও ক্ষমতা বা প্রভাবের প্রতি আসক্তি সবচেয়ে তীব্র। এই নেশা এতটাই তীব্র যে, অন্য আর কোনো কিছুর জন্যই মানুষ এতটা ধৃষ্টতা দেখানো, ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া বা অন্যের প্রয়োজন ও অনুভূতির প্রতি এতটা নির্লিপ্ত হওয়ার ঘটনা আর কোনো কিছুতেই দেখা যায় না।

দুর্ভাগ্য হলো বর্তমানে অধিকাংশ লোক বিশেষ করে লোভ-লালসায় আসক্ত অনেকেই সর্বনিম্ন স্তরে মৌলিক চাহিদা বা পার্থিব আরাম-আয়েশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী অর্জনের জন্য নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে। অনেকটা কর্দমাক্ত রাস্তায় আটকে নিজের চেহারা-সুরত কালিমালিপ্ত করে সময়ক্ষেপণ করেন। ফলে জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য তাদের জন্য অধরাই থেকে যায়। সমাজও নিক্ষিপ্ত হয় গভীর অন্ধকারে।

লোভ লালসার কারনে তারা হারাম বস্তুকে হালাল বলে চালিয়ে দেয়। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন- সুরা বাকারা আয়াত ২৭৫

قَالُوۡۤا اِنَّمَا الۡبَیۡعُ مِثۡلُ الرِّبٰوا ۘ وَ اَحَلَّ اللّٰهُ الۡبَیۡعَ وَ حَرَّمَ الرِّبٰوا 

“তারা বলেছেঃ ক্রয়-বিক্র য় ও তো সুদ নেয়ারই মত! অথচ আল্লা’হ তা’আলা ক্রয়-বিক্র য় বৈধ করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন”।

উপরোক্ত এই ০৫ টি মাধ্যমে শয়তান আমাদের সাথে প্রতারনা করে, এই প্রতারণাগুলো থেকে বাচতে পারলেই শয়তানের সাথে জিহাদ করা হবে। মানুষেরও উচিত তার সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিতে কুরআন-সুন্নার যথাযথ  অনুসরণ করার মাধ্যমে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া। ‘মুখতাছার যাদুল মা‘আদ’ গ্রন্থকার বলেন,

শয়তানের সাথে জিহাদ দুই প্রকার :

(১) যেসব সন্দেহের কারণে ঈমান নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা শয়তানের সেসব ওয়াসওয়াসার বিরুদ্ধে জিহাদ করা।

(২) যেসব পাপ কাজের জন্য আসক্তি নিক্ষেপ করে তা প্রতিহত করতে জিহাদ করা।

সুরা আল ইমরানের ১০২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللّٰهَ حَقَّ تُقٰتِهٖ وَ لَا تَمُوۡتُنَّ اِلَّا وَ اَنۡتُمۡ مُّسۡلِمُوۡنَ

হে বিশ্বাসিগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণকারী (মুসলিম) না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না

তাই আমাদেরকে শয়তানের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হলে তার সকল কৌশল ও প্রতারণা থেকে বেচে থাকতে হবে তাহলেই আমরা তার সাথে জিহাদ করে জয় লাভ করতে পারবো ইনশাল্লাহ।

৩। পাপী মুসলমানদের সাথে জিহাদ

অভ্যন্তরীণ শত্রু তথা শয়তান ও নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করে যে ব্যক্তি জয়লাভ করতে পারবে, তার উপর অন্যান্য শত্রুদের সাথে জিহাদ করাও ওয়াজিব। প্রথমেই আসে গুনাহগার ও পাপী মুসলমানদের কথা। তাদের সাথেও জিহাদ করতে হবে। তবে তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ারের জেহাদ নেই। তাদেরকে সাধ্য অনুযায়ী সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করতে হবে।

রাসূল (সাঃ) বলেন

,مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ

অর্থঃ “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখে সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়। হাত দিয়ে বাধা দিতে না পারলে জবান দিয়ে বাধা দিবে। তাও করতে না পারলে অন্তর দিয়ে হলেও বাধা দিবে। এটি সবচেয়ে দুর্বল ঈমানের পরিচয়”।
(সহীহ মুসলিম, প্রথম খন্ড, কিতাবুল ঈমান) হাদিস নম্বর-৮৩ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

আল্লাহ তায়ালা বলেন সূরা তাওবাঃ আয়াত- ২৯

قَاتِلُوا الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِاللّٰهِ وَ لَا بِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَ لَا یُحَرِّمُوۡنَ مَا حَرَّمَ اللّٰهُ وَ رَسُوۡلُهٗ

তাদের সাথে যুদ্ধ কর যারা আল্লাহতে ঈমান আনে না এবং শেষ দিনেও নয় এবং আল্লাহ ও তার রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম গণ্য করে না,

তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন সুরা আনামঃ আয়াত ১১৬

وَ اِنۡ تُطِعۡ اَکۡثَرَ مَنۡ فِی الۡاَرۡضِ یُضِلُّوۡکَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ؕ اِنۡ یَّتَّبِعُوۡنَ اِلَّا الظَّنَّ وَ اِنۡ هُمۡ اِلَّا یَخۡرُصُوۡنَ

আর যদি আপনি যমীনের অধিকাংশ লোকের কথামত চলেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে।(১)। তারা তো শুধু ধারণার অনুসরণ করে; আর তারা শুধু অনুমানভিত্তিক কথা বলে,

তাই পাপী মুসলমানদের সাথে সৎ উপদেশ দ্বারা জিহাদ করে যেতে হবে।

৪। মুনাফীকদের বিরুদ্ধে জিহাদঃ

মুনাফিকদের সাথে যুদ্ধ করার পূর্বে মুনাফিক কারা তা জানা দরকার। একটি হাদিসের মাধ্যমে মুনাফিকদের চিনার সহজ উপায়গুলো বলে দিয়েছে। হাদিসটি হলো।

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, চারটি অভ্যাস যার মধ্যে পাওয়া যায়, সে নিখাদ মুনাফিক। এছাড়া যার মধ্যে এর কোনো একটি পাওয়া যায়, সে তা ত্যাগ না করা পর্যন্ত তা তার মধ্যে মুনাফিকির একটি অভ্যাস হিসেবে বিদ্যমান থাকে। ওই চারটি অভ্যাস হচ্ছে, কখনও আমানত রাখলে সে তার খেয়ানত করে, কথা বললে মিথ্যা কথা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে এবং যখন কারও সঙ্গে ঝগড়া করে তখনই (নৈতিক ও সততার) সমস্ত সীমালঙ্ঘন করে। (বুখারি ও মুসলিম শরিফ)।

উপরোক্ত ০৪ টি অভ্যাস বা যেকোন ০১ টি অভ্যাস যার মধ্যে দেখা যাবে সেই মুনাফিক হিসাবে চিহ্নিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে।

মুনাফীকদের বিরুদ্ধে জিহাদের অর্থ এই যে, তাদের সন্দেহগুলো খন্ডন করা এবং তাদের মতবাদ থেকে সরলমনা মুসলমানদেরকে সাবধান ও সচেতন করা।  মুনাফীকদের বিরুদ্ধে জিহাদ জবান এবং সামর্থ থাকলে হাতের মাধ্যমেই হবে। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারন না করাটাই উচিত তবে তাদের উপর কঠোর হতে হবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন সূরা আত-তাহরীম, আয়াত ৯

یٰۤاَیُّهَا النَّبِیُّ جَاهِدِ الۡکُفَّارَ وَ الۡمُنٰفِقِیۡنَ وَ اغۡلُظۡ عَلَیۡهِمۡ

অর্থঃ “হে নবী! কাফের ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হোন।

মুমিন ও মুনাফিকদের গুণ-বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করার পর এই আয়াতে মুনাফিকদের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) বিশ্বমানবতার প্রতি রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন। গোটা সৃষ্টিজগত্ তাঁর অনুগ্রহ লাভে ধন্য হয়েছে। কাফির ও মুনাফিকরাও তাঁর অনুগ্রহ, অনুকম্পা থেকে বঞ্চিত হয়নি। মুনাফিকদের সব অপকর্ম জেনেশুনেও তিনি তাদের প্রতি অত্যন্ত সহনশীলতা প্রদর্শন করেছেন। তাদের অন্যায়-অপরাধ তিনি ক্ষমার চোখে দেখতেন। তাঁর দয়াশীলতা ও ক্ষমা যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের প্রতি কঠোরতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা পরিস্থিতির কারণে কখনো কখনো কঠোরতা প্রদর্শন জরুরি হয়ে পড়ে। দেশ ও সমাজের স্থিতিশীলতা এবং শৃঙ্খলা বিধানের স্বার্থে মুষ্টিমেয় অপরাধীর বিরুদ্ধে কঠোর প্রদক্ষেপ গ্রহণ আইনসিদ্ধ বিষয়।

মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের ধরন ও প্রকৃতি কী হবে—এ নিয়ে মতভেদ পাওয়া যায়। হজরত আলী (রা.) মনে করেন, তাদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করতে হবে। তবে শ্রেষ্ঠতম তাফসিরবিদ হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে, এখানে জিহাদ বা কঠোর পদক্ষেপ বলতে অর্থনৈতিক অবরোধ, সামাজিক বয়কট ও যুক্তিতর্ক অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর দলিল হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো মুনাফিককে হত্যা করেননি। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও ঘোষণা করেননি।

হাত দ্বারা, জান দ্বারা, মাল দ্বারা ও অন্তর দ্বারা তাদের বিরুদ্ধে ঘরে-বাইরে সর্বত্র ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যাবতীয় শিরক, বিদ‘আত ও ফিস্ক্ব-ফুজূরীর বিরুদ্ধে মুমিনের গৃহকে লৌহ কঠিন দূর্গ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। মুমিনের চিন্তা-চেতনা, কথা ও কলম, আয় ও উপার্জন সবকিছুই সর্বদা নিয়োজিত থাকবে বাতিলের বিরুদ্ধে আপোষহীন যোদ্ধার মত। প্রত্যেক গ্রামে ও মহল্লায় আল্লাহর সেনাবাহিনী হিসাবে বয়স্ক ও তরুণদের একটি জামা‘আতকে সংগঠিত হ’তে হবে, যারা আমীরের নির্দেশনা মোতাবেক পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী নিজেদের জীবন, পরিবার ও সমাজ গড়ে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হবেন ও সমাজ সংস্কারে ব্রতী হবেন। হক্বপন্থী এই লোকদের সংখ্যা কোন স্থানে যদি তিনজনও থাকেন, তবুও তাদেরকে একজন আমীরের অধীনে জামা‘আতবদ্ধ হ’তে হবে ও ইসলামী অনুশাসন মোতাবেক জীবন যাপন করতে হবে। তথাপি তাগূতী শক্তির নিকটে যাওয়া যাবে না বা বিশৃংখল জীবন যাপনও করা চলবে না

আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন সুরা নিসা : ৭৬

اَلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا یُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ ۚ وَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا یُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ الطَّاغُوۡتِ

যারা ঈমান আনে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে। আর যারা কুফরি করে তারা তাগুতের পথে লড়াই করে।

সুতরাং মুনাফেকদের বিরুদ্ধে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে জিহাদ করতে হবে এবং কঠোর ভাষায় তাদের কর্ম-কান্ডের প্রতিবাদ ও প্রয়োজনে প্রতিরোধ করতে হবে। যেহেতু তারা মুসলিম সমাজেই বসবাস করে থাকে তাই তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা যাবে না (বরং না করাটাই উচিত)। এতে মুসলমানদের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়বে। নবী (সাঃ) মুনাফীকদেরকে দল থেকে বের করে দেন নি। তবে তিনি মুনাফীকদের চক্রান্তের বিরুদ্ধে সদা সর্বদা সজাগ থাকতেন।

 ‘তারা যখন ঈমানদার লোকদের সঙ্গে মিলিত হয়, তখন বলে আমরা ঈমান এনেছি। কিন্তু নিরিবিলিতে যখন তারা তাদের শয়তানদের সঙ্গে একত্রিত হয়, তখন তারা বলেন, আসলে আমরা তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি, আর উহাদের সঙ্গে আমরা শুধু ঠাট্টাই করি মাত্র।’ (বাকারা ১৪)

About ISLAMIC DAWAH FOUNDATION

Check Also

ঈমান (প্রথম অধ্যায়)

পাঠ-০৩ ঈমান কী الإِيمَانِ  (ঈমান) শব্দটি আরবী শব্দ যার বাংলা অর্থ বিশ্বাস স্থাপন করা, নিরাপত্তা …

সুরা আল ইমরান আয়াত ১০২ এর তাফসীর, ঈমান ও মুত্তাকী সম্পর্কে আলোচনা (নাজমুল আযম শামীম)

Download WordPress ThemesPremium WordPress Themes DownloadFree Download WordPress ThemesDownload WordPress Themes Freeudemy paid course free …

দ্বীন প্রতিষ্ঠা (নাজমুল আযম শামীম)

Download WordPress ThemesDownload Premium WordPress Themes FreePremium WordPress Themes DownloadDownload WordPress ThemesZG93bmxvYWQgbHluZGEgY291cnNlIGZyZWU=download intex firmwarePremium WordPress …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *